দুর্ভিক্ষঃ ১৯৭৪ এবং অতঃপর




কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের সমাজ কল্যানের সাবেক অধ্যাপক মরহুম দেলোয়ার হোসেন মানবসেবার ব্রত নিয়ে শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। সম্পর্কে আমার বড় খালু। আমার বয়স যখন ১৩ বৎসর ওনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। গুরুগম্ভীর গলার অধিকারি খালুকে একরকম ভয়ই পেতাম। কিন্তু খালুর বাসায় বেড়াতে গেলে লুকিয়ে লুকিয়ে আড়ালে ওনার কথাবার্তা ও আচরণ লক্ষ্য করতাম। জায়নামাজে দাঁড়িয়ে সুমধুর কন্ঠে কুরআন তেলোয়াত করে নামাজ পড়তেন - একধরনের ভালো লাগা কাজ করত। আম্মা-বড়খালা কে কি করত বা বলত ওত কিছু খেয়াল করার সময় ছিল না!

পরিপাটি ড্রয়িংরুমের এপাশ ওপাশ খালি হেঁটে দেখতাম । বড় ভাইয়া অপুর কিছু ক্রেষ্ট আর বইয়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করতাম এগুলোর সারবস্তু নিয়ে। কিন্তু শক্ত মলাটে বাঁধাই করা বইগুলো খুলে দেখার সাহস ছিল না। ভাইয়া আমার এরকম হাঁটাচলা দেখে মুচকি হাসত।

চারদিক CID এর মত তদন্ত শেষে একটা জায়গায় এসে সোফায় বসে পড়তাম। কারন ঐ জায়গায় একটা কালো রঙের অদ্ভুত জিনিস ছিল । আর পাশেই ছিল সিগারেটের এসট্রে। কিন্তু কখনও তাতে ছাই দেখিনি। কি জন্য জানি না! ভাইয়া জিজ্ঞাসা করলাম, 'এটা কি?' ওনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, 'চুরুট, এখান থেকে যাও।'

খালুর চশমাটা ছিল ঠিক বঙ্গবন্ধুর চশমার মত। আসলে ওনি তাঁর আদর্শকে ধারন করে চলার চেষ্টা করতেন বৈকি। আম্মুর কাছ থেকে জানতে পারি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে খালু ভুশ্চিবাজার ও তার আশেপাশে রেশন বন্টনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

বড়খালু তখনও অধ্যাপনা ছাড়েননি। সাথে সাথে আবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান পরিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। উল্লেখ্য তিনি তার লেখা একটি বইয়ের স্বত্ব বিক্রি করে ১৪ হাজার টাকা পান এবং কুমিল্লা ঠাকুরপাড়া মাজারের পাশে জায়গা কিনে ছোট একতলার একটি বাড়ি করেন।

ভুশ্চিবাজারে রেশন বন্টনের দায়িত্ব তিনি তার ম্যানেজারের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন যা উপরমহলকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তার দলেরই একজন পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় নেতা ( তিনি মারা গিয়েছেন, তাই তার নামটি বলছি না) তাকে ফাঁসিয়ে দেয়ার জন্য ত্রানকার্যক্রম মনিটরিং বিভাগের কাছে অভিযোগ করে এবং দলের কিছুলোক গিয়ে ম্যানেজারকে শাসিয়ে আসে। তদন্ত কমিটি সামান্য কিছু ভুল পেয়ে ম্যানেজারকে তার কারন জিজ্ঞাসা করলে, সে খালুর নির্দেশে সব করেছে বলে জানায়। ফেঁসে যান কাজেকর্মে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারন করা একজন সৈনিক। ঐ ম্যানেজারের এই কুকর্মের কথা সাধারণ জনগণ বুঝতে পেরে তাকে 'তৈয়্যা চোরা' নামে উপাধি দেয়। কিন্তু অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন পিছপা না হয়ে অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে নিজের মত করে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতির ত্রানকার্যক্রমের সংবাদগুলো বিশ্লেষন করলে, এরকম কিছু উদাহরণ দেখতে পাব। শতশত ত্রান চুরির সংবাদগুলোর মাঝে দু'একটি ফাঁসিয়ে দেয়ার খবর চাপা পড়ে যায়। সাধারন জনগণের ক্ষোভের ধোপে এরকম সংবাদগুলো খুব একটা পাত্তা পায় না। একে যে অনেক রাজনৈতিক নেতা ঢাল হিসেবে প্রতিপক্ষকে ঘাঁয়েল করার কাজে ব্যবহার করছেন তা স্পষ্ট। যুগে যুগে রাজনীতির এ নোংরা দিকটি চর্চা হয়ে আসছে। আমরা যদি বর্তমান করোনা লকডাউনের কার্যক্রমগুলো লক্ষ্য করি অনেক এলাকায় নিজদলের প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য শুধু প্রতিপক্ষের বাড়ির সামনে বাশেঁর বেড়া/দেয়ালিকা/চিকা সেঁটে দিয়ে অন্যান্য স্থানগুলোতে শীথিলতা বজায় রাখা যা ঐ পক্ষকে মানসিকভাবে উঁসকে দেয়ার একটা পায়তারাও বলা যায়।

আম্মু দেয়ার তথ্য মতে, দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা এমনই ছিল যে আমার নানা মরহুম আমিনুর রহমান চেয়ারম্যান বিত্তশালী হ-ওয়া সত্ত্বেও বাড়িতে একসময় চাউলের মজুদ ফুরিয়ে যায় । আব্বুর কাছ থেকে শুনেছি, দূর্লভপুর গ্রামের অনেক পরিবার আমাদের বাড়িতে রান্না করা ভাতের মাড় নিজের পরিবারের জন্য নেয়ার জন্য বসে থাকত। কুমিল্লার ভৌগলিক অবস্থান কৃষিবান্ধব হওয়া সত্ত্বেও যদি এরকম অবস্থা হয়, তাহলে সারা বাংলার কি অবস্থা হয়েছিল তা খুব সহজে অনুমেয়।



তৎকালীন সংবাদপত্র এবং বিভিন্ন বই থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে ছোট করে বলা যায়, প্রতিবেশি দেশ ভারতে খাদ্যের অপ্রতুলতা ও সীমান্ত উম্মুক্ত থাকাটাই দুর্ভিক্ষের জন্য মূলত দায়ী ছিল। যুদ্ধবিদ্ধস্ত রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রব্যবস্থা অনেকটা অসহায় ছিল। বাংলাদেশের মানুষের মাঝে ভারতবিদ্বেষটা কেন যে কাজ করে তার একটি ভালো উদাহরণ যে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ইত্তেফাকের তথ্য মতে, ঐ সময়টায় প্রতিদিন শুধুমাত্র ঢাকায় গড়ে প্রায় ৮৪ (অনাহারে ৭০) জন করে মারা যেত। ঠিক ঐ সময়টায় মার্কিন খাদ্যসাহায্য বন্ধ করে দেয়ায় নতুন রেশনিং কার্ড বন্ধ থাকাটাও এর একটি বড় কারন। যদিও কেউ কেউ নেতাকর্মীদের দূর্নীতিদের কথা টেনে আনেন , তাহলে তা হাস্যকর বৈকি। যখন কেউ কোন পন্যে পাশের বাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় তা ঐ বাজারে নিয়ে ব্যবসা করার জন্য কোন বিশেষ দলের লোক হতে হয় না। জাতব্যবসায়ী, মৌসুমী এবং প্রায় সব শ্রেনীর মানুষই লাভের আশায় পন্য মজুদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখনও প্রতিবছর যখন বাজেট ঘোষনা হয়, ঠিক তার আগে কিছু ব্যবসায়ী পন্য মজুদ করতে শুরু করেন। এরকম সুযোগসন্ধানীরা সব জায়গায় বিদ্যমান। কিন্তু সমীকরনের জনরোষ ক্ষমতাসীন দলের উপর গিয়েই বর্তায়।

১৯৭৪-১৯৭৫ সালে খাদ্য উৎপাদনের স্বাভাবিক দ্বারায় ছন্দপতন না ঘটলেও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি মানুষের নাগালের বাহিরে চলে গিয়েছিল। মূল্যবৃদ্ধির কারন যদি পন্য মজুদ বলে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করে তা নিতান্তই অনুমান থেকে দাবি। সেই সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পন্যমজুদ ব্যবস্থা অনুন্নত ছিল। বেশ কিছু স্থানে ধারাবাহিক বন্যায় সরবরাহ ব্যবস্থাও একেবারে দূর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান নদ-নদী সে সময়ের খরস্রোতা নদীর কাছে নস্যি এবং ভয়াবহতা মুলত কল্পনা থেকেও অনেক বেশি ছিল।

যখন একটি যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের প্রারম্ভিক একাউন্টে মাত্র ১৪ ডলার থাকে সেদেশের মেরুদন্ডটা খুঁজে পেতে বঙ্গবন্ধুর কি পরিমাণ ত্যাগ ও পরিশ্রম করতে হয়েছে ছোট্ট মগজের চিন্তায় আসবে না। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ ও তার প্রভাব প্রায় ৩-৪ বৎসর স্থায়ী হয়েছিল। বাজারের মুনাফালোভী কিছু লোক এই সময় বিভিন্নভাবে ফয়দা লোটার চেষ্টা করেছেন। শাসন ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর জন্য কৃত্রিম লবণ সঙ্কট তৈরি করে লবনের দাম আকাশচুম্বী করেছিল তারা। বঙ্গবন্ধু কারও উপরে ভরসা না করে অল্পকিছু দিনে চট্টগ্রাম থেকে মালবাহী ট্রেনে লবন এনে তা নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু দূর্বল অবকাঠামোতে যখন খাদ্য সাহায্য বন্ধ থাকে তখন পুরো খাদ্যব্যবস্থা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো দুঃসাধ্য ছিল বলা যায়।।



বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে মুনাফালোভী শয়তানের আত্নাগুলো আসলে আমাদের চারপাশেই মানুষের মুখোশ পরে ঘুরে। লবন নিয়ে কিছুদিন আগে গুজব ছড়িয়ে কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে মুনাফা লোভের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে ব্যবসায়ীরা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। অন্য প্রধান খাদ্যপন্য চালের কথা বলি, সে ক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রণ করাটা অনেক কঠিন কাজ। কার সারা বাংলা ধানের আবাদ হয় যার পুরোটা সরকারের পক্ষে সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে একেবারে শক্তহস্তে দমন করাটা অনেকটা কষ্টসাধ্য। ইতিমধ্যেই বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। শত শত কর্মহীন মানুষ গ্রামে ফিরে যাওয়ার স্থানীয় পর্যায়েই ধানের পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষকরা। কিন্তু এতে মুনাফালোভী গোষ্ঠী ভালোভাবেই জেগে উঠেছে। কৃষক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী যে যার সাধ্যমত ধান-চাল মজুদ করছে। সরকার চেষ্টা করেও তার চাল সংগ্রহের লক্ষমাত্রা অর্জন করতে পারছে না। বর্তমান বাজেট ও করোনা পরিস্থিতিকে পুঁজি করে প্রেতাত্নাগুলো উৎসবের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় গনতন্ত্রের ছায়ায় পুঁজিবাদের চর্চা আসলেই হাস্যকর এবং দুর্নীতির শুরুটা ঐ জায়গা থেকে। পুঁজিবাদের কি তা নিয়ে বহুল প্রচলিত একটি কৌতুক আছে। ধরুন, আপনার দু'টি গরু আছে। আপনি যদি একটি গরু বিক্রি করে ষাঁড় কিনেন তাহলে আপনি পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেন।অর্থনীতির ভাষায় পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজম বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বোঝানো হয় যেখানে বাজার অর্থনীতিতে মুনাফা তৈরির লক্ষ্যে বাণিজ্য, কারখানা এবং উৎপাদনের উপকরণসমূহের উপর ব্যক্তিগত মালিকানার নিয়ন্ত্রণ থাকে। ১৯৭৪ সালের দূর্ভিক্ষে কিছু বিশেষ চিত্র পরিলক্ষিত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢলে ঢাকা ছেয়ে গিয়েছিল ক্ষুধার্ত মানুষের চাপা কান্নায়। তার সাথে তুলনা করলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকট ভিন্ন। একটি কথা পরিষ্কার যে, বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যদি গ্রু বিক্রি করে গাধাও কিনে এখানে রাষ্ট্রের তেমন কিছু করার থাকবে না। আর সে চিত্রই বিভিন্ন গনমাধ্যমে আসছে। ইতিমধ্যেই লক্ষ লক্ষ লোক চাকুরি হারিয়ে নীড়ে ফিরে গেছেন কিংবা আংশিক বেতন মাটি কামড়িয়ে পড়ে আছেন।

[ছবিঃ ১. বঙ্গবন্ধুর চুরুট, ২. ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষঃ বাংলা ট্রিভিউন ৩ঃ লবনের দামবৃদ্ধির গুজবঃ একুশে টিভি]

(চলবে)

Pages