Friday, March 29, 2019

আমার নানা || চেয়ারম্যান মোঃ আমিনুল ইসলাম ( পর্ব ১)





কোচিং এ পরীক্ষা ছিল ৩১/০১২/২০১৩ | বিকাল ৪ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত | মোবাইল অফ করে রেখেছিলাম | পরীক্ষা দিয়ে মেসে ফিরছি | ভাবলাম একেবারে চা খেয়ে ৬ তলায় উঠি | যথারীতি বাসার কাছেই টং দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম | হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠল | আমার ছোট দুলাভাই ফোন করেছেন | রিসিভ করলাম |

দুলাভাইঃ হাসান, তুমি কই ? তোমার মোবাইল অফ থাকে কেন? তোমার আম্মা, খালা , আপা কেউ তোমাকে ফোন করে পাচ্ছে না |
আমি ঃ ভাইয়া, পরীক্ষা ছিল কোচিং এ | তাই মোবাইল অফ করে রেখেছি | কেন, কি হইছে ?
দুলাভাইঃ তোমার নানা তো আজ বিকালে মারা গেছেন | ( ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন |)

কন্ঠরোধ হয়ে আসছিল | কিছু বলতে পারছিলাম না |

দুলাভাইঃ কাল সকালে ১০.৩০ টায় মাটি দিবে | আসতে পারবানি |
আমি ঃ জ্বি | আমি শাহীন ভাইয়া, পিন্টু ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করতেছি | আসসালামু আলাইকুম |

চা হাতে নিয়ে প্রায় ৫-৬ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলাম | কিছু চিন্তা করতে পারতেছিলাম না | আপনজনের মৃত্যু অনেক কষ্টের | আমার বড় ভাগিনী সুমাইয়ার মৃত্যুর খবর যেমনটা ছিল | একবার দেখতেছি দোকানদার কি করতেছে , আরেকবার দেখছিলাম , দোকানে বসে থাকা একজন কাস্টমার কি করছে | একটু পাগলের মত দোকানদারের সাথে ব্যবহার করলাম |

আমি ঃ হম্মমামা ! হম্মমামা ! বিল কতও হইছে ?
দোকানদারঃ মামা, ১১ টাকা |

বসে থাকা কাস্টমার সম্ভবত আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা আঁচ করলেন |

কাস্টমারঃ ভাইয়া আপনি বসেন, চাটা শেষ করেন |
আমি ঃ ( কৃত্রিম একটা হাসি দিয়ে ) না ভাইয়া আপনি বসেন | আমার শেষ , চলে যাচ্ছি |

অনুভব করলাম | মানুষগুলোর হৃদয় এখনও মরে যায়নি | বিল দিয়ে তাড়াতাড়ি করে মেসে ঢুকলাম | বছরের শেষ দিন | মেসে গরুর মাংস এনেছিলাম | কিন্তু আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা , কুমিল্লা যেতে হবে | আম্মুকে ফোন করলাম | খালাতো ভাইদের ফোন দিলাম | একজন খালাতো ভাই বিকালেই ওনার বোনকে নিয়ে চলে গেছেন | আরেক খালাতো ভাইয়ের নতুন ব্যাংকে জয়েনিং ১ তারিখে | ওনি যেতে পারবেন না |

আমি আমার দাদাকে কখনও দেখিনি | দাদু ২০১২ তে মারা গিয়েছেন | নানার কাছ সেই ছোটকাল থেকে এমন কিছু পেয়েছি , যা স্মৃতিতে চির অম্লান হয়ে থাকবে |

নানা স্কুল টিচার ছিলেন | তারপর তিনি চেয়ারম্যান ইলেকশানে দাঁড়িয়েছে | স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই তিনি গ্রামের চেয়ারম্যান | আমাদের বাসায় প্রায়ই বেড়াতে আসতেন | স্কুল কলেজ জীবনটাতে ওনার সাথে প্রায়ই মর্নিং ওয়াকে বের হতাম | তখন ওনার কাছ থেকে বিভিন্ন গল্প শুনতাম | ওনার যৌবনকালের গল্প শুনে হা করে থাকতাম |

ওনি বেনসন সিগারেট ছাড়া খেতেন না | আমি অবাক তখন বাংলাদেশে বেনসন পাওয়া যেত ! ওনি আমাকে জানালেন, লন্ডন থেকে কেউ আসবে শুনলে, কার্টনের জন্য বলে দিতেন | হোন্ডা চালাতেন | সবসময় একজন রিকশা ড্রাইবার থাকত ওনার জন্য | ওনার প্রিয় ছিল ওনার দোনালা বন্দুক | ওটা ছাড়া ওনি বের হতেন না|

নানানাতী প্রায়ই কুমিল্লা এয়ারপোর্ট (বর্তমানে ইপিজেড ) এ দিকে যেতাম হাঁটার জন্য | একদিন ওনি আমাকে স্বাধীন হওয়ার পর ওনি প্লেনে করে ঢাকা থেকে কুমিল্লা এসেছিলেন | কখনও আমি কুমিল্লা এয়ারপোর্টে প্লেন দেখিনি | নানার এ কথা শুনে খুব আগ্রহ হত | তিনি জানালেন সেবার তোর বড় খালু প্লেনের টিকেট কেটে দিয়েছিল | প্লেনে ওঠে একটা বেনসন ধরালাম | সিগারেট শেষ | জানালা দিয়ে দেখি আমি কুমিল্লা চলে আসছি | নানা হাসতেন , এসব গল্প বলে |

পর পর তিনবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন | স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করতেন ভুল ইনফরমেশন দিয়ে | মেজনানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হওয়ার পর রাজাকাররা এসে আমার নানাদের ঘর পুড়িয়ে দেয় | স্বাধীন হওয়ার পর থেকে নানার ধাপট কমতে থাকে নতুন কিছু রাজাকারের চক্রান্তে | বিভিন্ন মামলা -মোকদ্দমায় তাকে ফাঁসিয়ে তাকে আস্তে আস্তে নিঃস্ব করে ফেলে তার আসেপাশের প্রতিবেশীরা | বিভিন্ন সরকারে এমপিরা এসে খালি আশ্বাস দিয়ে যেত সমাধানের | কিন্তু কখনই তারা করেনি | খালি ভোটের সময় আসলেই নানার কদর বেড়ে যেত তাদের কাছে | সহজ সরল লোকটাকে দিয়ে যে তাদের স্বার্থ ভালো উদ্দ্বার হবে তা তারা ভালো করেই জানতো |

নানার কাছে শুনতাম মুক্তিযুদ্ধের গল্প | আমাকে বলতেন, আসল খারাপ ছিল রাজাকাররা | পাকিস্তানিদের গরু - ছাগল দিলেই এরা খুশি হয়ে যেত | ওনার কাছেই শুনতাম, মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত হয়েছে হিন্দুরা | চেয়ারম্যান হওয়াতে অনেক হিন্দু রাতের আধাঁরে নানাদের বাড়ি চলে আসত | বিয়ে উপযুক্ত মেয়ে নিয়ে বৃদ্ধ অথবা ছোট ছোট মুখ নিয়ে উদ্বিগ্ন মা-বাবা | সাথে নিয়ে আসতেন , ওনাদের সারা জীবনে সঞ্চয় | নানার সামনে রেখে পায়ের কাছে লুটায়ে পড়তেন , বর্ডার পার করে দেয়ার জন্য | নানা কিছুই তো রাখতেনই না | উল্টো ওনাদের খাইয়ে রাতের আধাঁরে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় বর্ডার পার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিতেন |

আম্মুর কাছে একটা গল্প শুনেছি | ঢাকা থেকে একবার একলোক তার একমাত্র মেয়েকে ( ১৩-১৪ বছর বয়স ) হেঁটে নানাদের বাড়ি এসেছেন খালি এতটুকু জেনে যে নানা কাউকে ফেরাতেন না | মেয়েটির পা নাকি ফুলে অনেকে মোটা হয়ে গিয়েছিল | আম্মু সারারাত ওই মেয়ের পা মালিশ করে দিয়েছিলেন | তার সাথে আম্মুর অনেক সখ্য হয়েছিল | কিন্তু ওনারা ইন্ডিয়া চলে যান একসময় | আম্মু আজও ওই মেয়েটির কথা ভুলতে পারেন না | খালি বলেন, দেশ স্বাধীন হল | মেয়েটি আমার সাথে একবারও যোগাযোগ করেনি | স্বাধীনতা হয়ত মানুষের অনেক কিছু কেঁড়ে নিয়েছে | বিবেকবোধ , স্মৃতি | আম্মু এতটুকু হয়ত বুঝে উঠতে পারেননি |

যাই হোক মেসে সবাইকে জানালাম , আমি কুমিল্লা যাচ্ছি | আর সবাইকে নানার মৃত্যুর খবর জানিয়ে রওনা দিলাম | সবাই আমাকে সাবধানে যেতে বলল | ভাত না খেয়েই রওয়ানা | কিন্তু ০১/০১/২০১৪ তে অবরোধ | রাত ৯.১৫ টা | সায়েদাবাদ পৌঁছে গাড়ি পাব কি পাব না , রাস্তায় লোকজন কম | তাই কোন কিছু চিন্তা না করে সাইকেল নিয়ে নিলাম | কিন্তু হায় বিধিবাম | কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হল , টাকা আনতে ভুলে গিয়েছি | এটিএম কার্ডের কথা মনে পড়ল | ভাবলাম ১০০০ আছে | চলে যাবে | সায়েদাবাদ পৌঁছে গেলাম | আবার একি ভুল | টাকা তো তোলা হয়নি | মানিকনগরের কাছাকাছি এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে সায়েদাবাদ আসলাম | রাত ১০.৩০ টা | প্রাইম বাস নজরে পড়ল | একসয় বাসটা অনেক নামি দামী পরিবহন ছিল | আজ এটার অবস্থা তলানীতে এসে পৌঁচেছে | কিন্তু আমার জন্য আজ সে আশীর্বাদ | দরদাম হল , আমার জন্য ১২০ আর আমার পংখীরাজের জন্য ৫০ |

স্থান, কাল এবং পাত্র একে অন্যের পরিপূরক | কালের আবর্তে সম্পদের মূল্য কোথায় গিয়ে ঠেকে তা আমরা কেউ বলতে পারি না | বিধাতা কার নিয়তি কোথায় ঠিক করে রেখেছেন, কে জানে ? নিজের অবস্থান ধরে রাখাটাই অনেক সময় কষ্টকর |

বাসের ছাদে ওঠলাম | কন্ট্রাকটরকে সাইকেল ছাদে বাধার কাজে সাহায্য করলাম | ছেলেটা আমাকে একটু অপরাধের সুরে একটা কথা বলল |

কন্ট্রাকটরঃ ভাই ! কাজটা আসলে আমার | আপনারে অনেক কষ্ট দিচ্ছি | কিছু মনে কইরেন না |
আমিঃ আরে ভাই ! কি বলছ | তুমি নিজে কত কষ্ট করো |

আসলে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখকর ব্যাপার হচ্ছে , সামাজিক রীতিনীতির সাথে জড়িত থেকে কাউকে সম্মান করা | এতে আপনার সম্মানের কোন হানি হবে না | বরং স্বর্গীয় সুখ পাবেন |

নিচে নামলাম ছাদ থেকে | কোথা থেকে এক লোক আসল |

জনৈক লোকঃ ভাই, সাইকেলে পার্কিং চার্জ দেন |

ইচ্ছা করতেছিল , কইষ্যা গালে তারে একটা দেই | কিন্তু কি করব | আজকে দিনে তো আর পারব না | কিছুক্ষন তারে কতক্ষন টাকার জন্য ঘুরালাম | ঘুরায়ে বাসে ওঠার সময় ১০ টাকা দিলাম |

এ শ্রেণীর লোক ধান্দাবাজ টাইপের হয় | এদের মূল ধান্দা থাকে , কিভাবে কাজ না করে টাকা কামানো যায় | মুখের কথা খরচ , এটা কোন ম্যাটার না |

বাসের সিটে বসে , আম্মুকে রিং দিলাম| খালাম্মা জানালেন, আম্মু নামাজ পড়ছে | আব্বাকে রিং দিলাম | আব্বু আমার আসার আনুমানিক সময় জেনে সাবধানে আসতে বললেন |

বাস ১১.১০ এ ছাড়ল | যাত্রাবাড়ী মোড়ে এসে ভালো একটা জ্যামে পড়ল | প্রায় ৪০ মিনিট হয়ে গেল | কোন গাড়িই নড়ছে না | আমি খালি ফ্লাইওভারে দিকে তাকিয়ে আছি | কেন জানি , ছল ছল চোখে প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিল |

(চলবে )