বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অন-ক্যাম্পাস জব

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অন-ক্যাম্পাস জব

কেমন হয় যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সেখানেই খন্ডকালীন কাজ করে নিজের ব্যয় মেটানোর একটা চেষ্টা করা যেত! আবার বোনাস হিসেবে যদি ডিগ্রী লাভের পাশাপাশি সিভিতে এই চাকুরীর অভিজ্ঞতাও যুক্ত করা যেত! বাংলাদেশের অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এ চর্চাটা সীমিত আকারে অনেক আগে চালু থাকলেও এ বছর তার প্রভাব ধীরে ধীরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও পরতে শুরু করেছে। কিন্তু সবচেয়ে দামী ধাতু টাইটানিয়ামের খোলসে আবৃত বাংলাদেশের যে জাত রক্ষার অপসংস্কৃতির টাবু তার ভাঙন যে কোন প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে কি পরিসরে হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় থেকে যায়।

বরাবরই ডেইলী স্টারের একটি খবরে চোখ আটকে যায় -  "On-campus job for DU students" (The Daily Star, 2022). বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুকরণ করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভিতরেই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আগামী বৎসরের ভিতর খন্ডকালীন চাকুরীর ব্যবস্থা শুরু করতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত অন-ক্যাম্পাস জবগুলোর ভিতর রয়েছে  ভলান্টিয়ারিং, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট, লাইব্রেরী এটেন্ডেন্ট, ফ্রন্টডেস্ক অফিসার, স্টুডেন্ট টিউটর, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, গ্রাফিকস ডিজাইনার, মার্কেটিং অফিসার, স্টার্টআপ হিসেবে ক্যাম্পাসে ব্যবসা (যেমনঃ রেষ্টুরেন্ট, ট্রান্সপোর্ট প্রোভাইডার ইত্যাদি) বা কাজ। তবে মোট ছাত্র-ছাত্রীর তুলনায় যে এ কাজগুলো খুবই অল্প তা বলার জন্য খুব বড় বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেশীরভাগ ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক সঙ্গতি সন্তোষজনক হওয়ায় তাদের খুব বেশি অস্বস্তি পোহাতে হচ্ছে না।

আমাদের দেশে অন-ক্যাম্পাস চাকুরীর ধারনা যে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে তা ফানেলের ভিতর দিয়ে ছেঁকে ছেঁকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধরা দিয়েছে বৈকি, কিন্তু ধীরে ধীরে। সাধারণ অন-ক্যাম্পাস জবে উপরে বর্নিত কাজগুলোর পাশাপাশি যে Blue Collar কাজগুলোও অন্তর্ভুক্ত তা খুব সীমিত পরিসরে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুরু হয়েছে। কিন্তু এই কাজগুলোকে পাশ কাটিয়ে আমাদের সামষ্টিক ধারণা নির্দিষ্ট কয়েকটি পেশাতেই সীমাবদ্ধ। এক্ষেত্রে কিছু কিছু উদ্যোক্তা ছাত্র-ছাত্রী তাদের মেধা ও শ্রমের সন্নিবেশে অধ্যয়নরত ক্যাম্পাসে কিছু সৃজনশীল স্টার্টআপ শুরু করেছে যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিনশেষে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারনে নির্দিষ্ট গন্ডির বাহিরে অন-ক্যাম্পাস বিস্তারে কতটুকু উদারভাবে কাজ করতে পারে - তা নিয়ে কমবেশী দ্বিধা থাকতে পারে। যদিও দেশের নামকরা কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যতটুকু করছে তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পথ দেখাবে এতে সন্দেহ নেই।

অবস্থাভেদে ছাত্রছাত্রীদের হাত-খরচ বা পড়াশোনার খরচ বা সম্পূর্ন নিজস্ব ব্যয়ভার বহন করার জন্য বহুল প্রচলিত পেশার ভিতর রয়েছে প্রাইভেট টিউশন বা কোচিং এ পড়ানো। এখনও অনেক অভিভাবক আছেন যারা এটাকে অনেক সম্মানের দৃষ্টিতেই দেখেন এবং এটা প্রচলিত সংস্কৃতির কারনে বেশীরভাগ ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্বস্তিদায়ক। যদিও অনেক ছাত্রছাত্রী আছেন, প্রচলিত এই ধারনা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন অনেক পেশাতেই নিযুক্ত আছেন, যেমনঃ ফ্রিল্যান্সিং লেখালেখি, কল-সেন্টার, ফিল্ড সার্ভে, মার্কেটিং, এডাভার্টাইজিং, ইভেন্ট ম্যানেজম্যান্ট ইত্যাদি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, অন-ক্যাম্পাস জবগুলোতে মজুরীর সমন্বয় না করলে তা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এসব অফার গ্রহনে নিরুৎসাহিত করার যথেষ্ট সুযোগ করে দিবে। এখানে লক্ষনীয় যে, আমাদের দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেদের পড়াশুনা বা থাকা-খাওয়ার খরচ নিজেরাই বহন করার চেষ্টা করে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলো অন-ক্যাম্পাস চালু করতে গেলে কম-বেশী অনেক বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। কারন ক্যাম্পাসগুলোর ভৌগলিক অবস্থান, প্রচলিত ব্যবস্থাপনা ও তাদের পুনর্বাসন অথবা সমন্বয়, চাহিদাসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীসংখ্যা, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, সঙ্গতিপূর্ণ মজুরী, বাজেট ইত্যাদি নানাবিদ সমস্যার সমাধান ও বাস্তবায়নকল্পে একটি দক্ষ ইস্পাত-কঠিন কমিটি কাজ করতে হবে। তারপর রয়েছে ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকগনকে অন-ক্যাম্পাস জবগুলোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধকরণ।

বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যবস্থায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পার করার পরপরই সরকারি চাকুরি ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশের লক্ষ্যে পরিণত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতার কোন প্রয়োজন হয় না বা কো-কারিকুলার একটিভিটসগুলো থোরাই কেয়ার করা হয়। অন্যদিকে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যক্রমের বাহিরে এসব চেষ্টাকে খুব ভালোভাবেই মূল্যায়ন করে থাকে। বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে বিভিন্ন উন্নত-অনুন্নত রাষ্ট্র তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রছাত্রীদের দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে অন-ক্যাম্পাস জবগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ মাত্র শুরু করতে যাচ্ছে। অন-ক্যাম্পাস জব নিশ্চিত করতে পারে ছাত্রছাত্রীদের আর্থিক সচ্ছলতা ও মানসিক প্রশান্তি, বাঁচাতে পারে সময় ঘন্টা, দিতে পারে ব্যক্তিনিরাপত্তা। QS বা THE র‍্যাংকিংগুলোতে তো আর নিজদের নাম হুটহাট আসবে না! পরিকল্পনাগুলোর চেষ্টা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আসবে।

Resource:

The Daily Star. (2022, September 12). On-campus job for DU students. The Daily Star. https://www.thedailystar.net/news/bangladesh/news/campus-job-du-students-3118011

সম্পর্কিত লেখা

Comments